নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে আদালতের কাছে ১৬টি ভিন্ন ভিন্ন নথি পেশ করেছিলেন এক ব্যক্তি। তবে সমস্ত নথি খতিয়ে দেখার পর গুয়াহাটি হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, আবেদনকারী নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
গত ৩০ জুন বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং বিচারপতি শামীমা জাহানের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দেন। আদালত পর্যবেক্ষণ করে জানায়, ১৯৬৪ সালের বিদেশী আইনের ধারা ৯ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করার সম্পূর্ণ দায়ভার সেই ব্যক্তির ওপরেই বর্তায়। এক্ষেত্রে আবেদনকারীর জমা দেওয়া ১৬টি নথি তাকে ‘বিদেশী নন’ বা ‘ভারতীয় নাগরিক’ হিসেবে প্রমাণ করতে সাহায্য করছে না।
মামলাটি আমিনুল হক নামক এক ব্যক্তির দায়ের করা রিট পিটিশনের ভিত্তিতে শুরু হয়। গুয়াহাটির ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমিনুলকে ‘বিদেশী’ বলে ঘোষণা করেছিল। ট্রাইব্যুনালের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করেই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তিনি।
আদালতে নিজের পক্ষে আমিনুল যে সমস্ত নথি জমা দিয়েছিলেন, তার মধ্যে ছিল ১৯৫১ সালের জাতীয় নাগরিক পঞ্জির (এনআরসি) অনুলিপি (যেখানে তার দাদা-দাদী এবং বাবার নাম ছিল)। ১৯৬৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাবা-মা এবং তার নিজের নাম সংবলিত ভোটার তালিকার সার্টিফাইড কপি, ১৯৭৩ সালের জমি ক্রয়ের দলিল, প্যান কার্ড, ভোটার আইডি এবং একটি স্কুল সার্টিফিকেট।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে আসামের চূড়ান্ত এনআরসি তালিকা প্রস্তুত করা হলেও তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিফাই করা হয়নি।
কেন বাতিল হলো নথি ও দাবি?
আবেদনকারী দাবি করেছিলেন যে তার পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাস করছে। শুনানির সময় আমিনুলের বাবা আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে আমিনুলকে নিজের সন্তান হিসেবে শনাক্ত করেন। তবে আদালত এই মৌখিক সাক্ষ্যকে অপর্যাপ্ত বলে খারিজ করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ, উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য দালিলিক প্রমাণ ছাড়া কেবল মৌখিক বক্তব্য বাবা ও ছেলের আইনি সম্পর্ক বা সংযোগ প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।
আবেদনকারীর আইনজীবী যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আমিনুল একজন অভিবাসী শ্রমিক এবং কিছু নথিতে তার বাবা ও দাদার নামের বানানে অসঙ্গতি থাকার কারণে তাকে ট্রাইব্যুনাল বিদেশি ঘোষণা করেছে।
নামের বানানের এই তারতম্যকে আদালত খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও মূল সমস্যাটি চিহ্নিত করেছে অন্য জায়গায়। আদালত রায়ে জানায়, ‘আবেদনকারীর বাবার চার ধরনের নাম (মহিরুদ্দিন শেখ, মাহরুদ্দিন শেখ, মহিরুদ্দিন এবং মহির উদ্দিন) এবং দাদার নামের বানানের অসঙ্গতিকে আদালত গুরুত্ব সহকারে দেখছে না। কিন্তু আবেদনকারী এটা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, তাদের পরিবারের সদস্যরা (পাসান আলী, মহিরুদ্দিন বা আবেদনকারী আমিনুল হক) দোবাকুরা, ঘুঘুডোবা এবং হাসডোবা—এই তিনটি গ্রামের ভোটার তালিকায় ধারাবাহিকভাবে একসঙ্গে ছিলেন।’
আদালত আরও যোগ করে, ভোটার তালিকার এই ফাঁকফোকর ঢাকতেই কোনো রকম নথিপত্র ছাড়াই মৌখিকভাবে দাবি করা হয়েছে যে, পরিবারটি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে স্থানান্তরিত হয়েছিল।
এছাড়া ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর ‘হাসডোবা আঞ্চলিক হাইস্কুল’ থেকে দেওয়া একটি স্কুল সার্টিফিকেট জমা দেওয়া হয়েছিল, যেখানে উল্লেখ ছিল ছাত্রটি ১৯৯৯ সালে স্কুল ছেড়েছে। তবে আদালত জানিয়েছে, যিনি এই শংসাপত্রটি তৈরি করেছেন (প্রধান শিক্ষক), তিনি আদালতে এসে এটির সত্যতা নিশ্চিত করে কোনো সাক্ষ্য দেননি। ফলে এই নথিটিও গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
এসব কিছু মিলিয়ে তাই চূড়ান্ত শুনানিতে ট্রাইব্যুনালের আগের রায় বহাল রেখে হাইকোর্ট আবেদনকারীর পিটিশনটি খারিজ করে দেয়।


